"My personal take on architecture. Exploring how we live, breathe, and connect within the walls we build."
How I see it
architecture 101
1.2 Definition
1.6
একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি।পুরান ঢাকার গলিগুলো কে ডিজাইন করেছেন?- কেউ না।কোনো স্থপতি বসেননি। কোনো পরিকল্পনা হয়নি। কোনো blueprint আঁকা হয়নি। তবু সেই গলিগুলো কাজ করছে। হাজার বছর ধরে। কিভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একজন গণিতবিদ একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলেন।তাঁর নাম René Thom। ফরাসি গণিতবিদ। Fields Medal বিজয়ী। মানে গণিতের নোবেল।তিনি একদিন মশার ঝাঁক দেখছিলেন। একটু ভাবুন। মশার ঝাঁক দেখেছেন? সন্ধ্যাবেলা পুকুরের ধারে হাজার হাজার মশা একসাথে উড়ছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় একটা বিশাল জিনিস। একটা মেঘের মতো। স্থির। সুশৃঙ্খল। কাছে গেলে দেখা যায় — প্রতিটা মশা এলোমেলো উড়ছে। কোনো নিয়ম নেই। কেউ কাউকে বলছে না কোথায় যেতে হবে। তবু মিলে একটা সুন্দর আকার। René Thom জিজ্ঞেস করলেন — কেন?উত্তর পেলেন।প্রতিটা মশা একটাই নিয়ম মানে। যদি আশেপাশে অর্ধেকের বেশি ফাঁকা দেখি — মশার দিকে এগিয়ে যাব। ব্যস।এই একটা সহজ নিয়ম থেকে সেই বিশাল সুন্দর ঝাঁক তৈরি হয়। কোনো পরিকল্পনা নেই। কোনো leader নেই। কোনো blueprint নেই। শুধু একটা নিয়ম। আর সেখান থেকে একটা Pattern
শহরও এভাবে কাজ করে। প্রতিটা পরিবার একটা সহজ নিয়ম মানে।"আমার বাড়ির সামনে একটু খোলা জায়গা রাখব।""পাশের বাড়ির সাথে মিলিয়ে একটা পথ রাখব।""যেখানে মানুষ আসে সেখানে দোকান বসাব।"এই সহজ স্থানীয় নিয়মগুলো মিলে পুরান ঢাকার গলি তৈরি হয়েছে। কোনো স্থপতি ছিলেন না। কোনো masterplan ছিল না। শুধু মানুষের সহজ জীবনের নিয়ম। আর সেখান থেকে একটা জীবন্ত শহর।
রবীন্দ্রনাথের কথা মনে করুন। তিনি শান্তিনিকেতন বানিয়েছিলেন। কোনো বিশাল masterplan ছিল না। কোনো ঝকঝকে architect ছিলেন না। ছিল একটা সহজ নিয়ম — "প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে শিখতে হবে।" সেই একটা নিয়ম থেকে শান্তিনিকেতনের পুরো স্থানিক দর্শন তৈরি হয়েছে। গাছের নিচে পড়ানো। খোলা মাঠে খেলা। নদীর ধারে হাঁটা।রবীন্দ্রনাথ স্থপতি ছিলেন না। কিন্তু স্থানের ভাষা জানতেন। একটা সহজ নিয়ম দিয়ে একটা জীবন্ত প্রতিষ্ঠান বানিয়েছিলেন। যেটা আজও কাজ করছে। এবার আধুনিক শহরে আসি। আধুনিক পরিকল্পনাকারীরা উল্টো কাজ করেন। তারা আগে global pattern ঠিক করেন। তারপর local নিয়ম চাপিয়ে দেন। "এখানে residential zone। ওখানে commercial zone। এই রাস্তা এতটুকু চওড়া হবে। ওই রাস্তা ওতটুকু।" সব ঠিক করা। সব নির্ধারিত। সব নিয়ন্ত্রিত। ফলাফল?
মানুষ সেই শহরে বাস করে। কিন্তু সেই শহর বাঁচে না।কারণ জীবন্ত শহর উপর থেকে নামানো যায় না। নিচ থেকে উঠতে হয়।মশার ঝাঁকের মতো। প্রতিটা মশা নিজের নিয়মে। মিলে একটা সুন্দর আকার।
বাংলাদেশে প্রতি দশ বছরে একটা নতুন Masterplan হয়। ঢাকার Masterplan। চট্টগ্রামের Masterplan। সিলেটের Masterplan। বিশাল বিশাল document। রঙিন রঙিন মানচিত্র। বড় বড় সংখ্যা। তারপর? Masterplan drawer-এর ফাইলে ঢোকে। পাঁচ বছর পরে নতুন সরকার আসে। নতুন Masterplan হয়। পুরনো Masterplan কেউ মনে রাখে না। কারণ সেটা কখনো কাজ করেনি। কিন্তু পুরান ঢাকার গলি কোনো Masterplan ছাড়াই হাজার বছর ধরে কাজ করছে। Masterplan-এ কোটি টাকা। গলি-তে শূন্য টাকা। কে জিতছে? René Thom-এর মশার ঝাঁকের গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হলো — কোনো মশার পুরো ঝাঁকটার ধারণা নেই।প্রতিটা মশা শুধু নিজের আশেপাশে দেখছে। নিজের সহজ নিয়ম মানছে। কিন্তু মিলে যে ঝাঁক তৈরি হয় সেটা প্রতিটা মশার চেয়ে অনেক বড়। শহরও তাই। পুরান ঢাকার কোনো বাসিন্দা পুরো শহরের কথা ভেবে বাড়ি বানাননি।শুধু নিজের পরিবারের কথা ভেবেছেন। নিজের প্রতিবেশীর কথা ভেবেছেন। নিজের গলির কথা ভেবেছেন।কিন্তু সেই সব ছোট ছোট সিদ্ধান্ত মিলে একটা জীবন্ত শহর তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এই জ্ঞান থেকে কি কিছু শেখার আছে স্থপতিদের জন্য? আছে। শেখার আছে যে — শহর উপর থেকে বানানো যায় না। শহর নিচ থেকে গড়ে ওঠে। স্থপতির কাজ পুরো শহর ডিজাইন করা না। স্থপতির কাজ সেই ছোট ছোট নিয়মগুলো বোঝা। সেগুলোকে সম্মান করা। এবং সেগুলোর সাথে মিলিয়ে কাজ করা। যে স্থপতি এটা বোঝেন — তিনি শহরের সাথে কাজ করেন। যে স্থপতি এটা বোঝেন না — তিনি শহরের বিরুদ্ধে কাজ করেন। আমি একজন স্থপতি হিসেবে বিশ্বাস করি —সবচেয়ে বুদ্ধিমান পরিকল্পনা সেটা না যেটা সবকিছু নির্ধারণ করে।সবচেয়ে বুদ্ধিমান পরিকল্পনা সেটা যেটা মানুষকে নিজের ছোট ছোট নিয়মে নিজের শহর গড়ে তুলতে দেয়।মশার ঝাঁককে কেউ উপর থেকে সাজায় না।তবু সে উড়তে পারে। তবু সে সুন্দর।শহরও তাই।
দুটো শহরের গল্প বলি।প্রথম শহর।রাস্তাগুলো সরু। এঁকেবেঁকে গেছে। কোথাও হঠাৎ চওড়া। কোথাও হঠাৎ সরু। একটা গলি থেকে আরেকটায় যাওয়া যায়। সেখান থেকে আরেকটায়।মানচিত্র দেখলে মনে হয় — কেউ মাতাল হয়ে এঁকেছে।কিন্তু সেই শহরে গেলে একটা জিনিস টের পাওয়া যায় —এখানে জীবন আছে।দ্বিতীয় শহর।রাস্তাগুলো সোজা। সমান্তরাল। প্রতিটা block একই মাপের। প্রতিটা বাড়ি একই দূরত্বে।মানচিত্র দেখলে মনে হয় — একজন প্রতিভাবান ইঞ্জিনিয়ার বসে বসে এঁকেছেন।কিন্তু সেই শহরে গেলে একটা জিনিস টের পাওয়া যায় —এখানে জীবন নেই।প্রথম শহর — পুরান ঢাকা। দ্বিতীয় শহর — ঢাকার যেকোনো নতুন আবাসিক প্রকল্প।কেন এই পার্থক্য?
দুটো শহরের বাইরের চেহারা আলাদা। কিন্তু আসল পার্থক্য ভেতরে।বাইরের চেহারাকে বলা হয় Phenotype। ভেতরের নিয়মকে বলা হয় Genotype।পুরান ঢাকার Genotype কী?মানুষ মিলবে। পথ খোলা থাকবে। অপরিচিতও আসতে পারবে।নতুন আবাসিক প্রকল্পের Genotype কী?মানুষ আলাদা থাকবে। পথ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। অপরিচিত আসতে পারবে না।দুটো সম্পূর্ণ আলাদা দর্শন। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ফলাফল।এবার পুরান ঢাকার একটু গভীরে যাই।পুরান ঢাকার গলিগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছিল?মুঘল আমলে ঢাকা ছিল বাংলার রাজধানী।তখন এখানে ব্যবসায়ী ছিলেন। কারিগর ছিলেন। নৌকার মাঝি ছিলেন। বুননশিল্পী ছিলেন।প্রতিটা পেশার মানুষ নিজেদের এলাকায় থাকতেন।তাঁতিরা একসাথে। কামারেরা একসাথে। ব্যবসায়ীরা একসাথে।এই পেশাভিত্তিক একত্রিত হওয়া থেকে গলিগুলো তৈরি হয়েছিল।শাঁখারি বাজার। তাঁতীবাজার। লোহারপুল।নামগুলোই বলে দেয় — এই গলিগুলো একটা জীবনযাত্রার ফসল।কোনো স্থপতির নয়।
এখানে একটু sarcasm করি।বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার স্থাপত্যের ছাত্রছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হন।তারা শেখেন — Zaha Hadid কীভাবে বাঁকানো বিল্ডিং বানাতেন। Le Corbusier কীভাবে pilotis ব্যবহার করতেন। Frank Gehry-র titanium facade কেন বিখ্যাত।কিন্তু তাদের শেখানো হয় না — পুরান ঢাকার গলি কেন কাজ করে। নিমতলীর বাজার কেন জীবন্ত। বুড়িগঙ্গার ঘাট কেন মানুষ টানে।বিদেশের বিখ্যাত স্থপতি শেখানো হয়। নিজের শহরের জ্ঞান শেখানো হয় না।ফলে আমরা পাচ্ছি — বিদেশের নকল বিল্ডিং। নিজের শহরের প্রাণ না বুঝে তার উপর চাপিয়ে দেওয়া আধুনিকতা।Genotype আর Phenotype-এর পার্থক্যটা আরেকটু পরিষ্কার করি।দুটো মানুষের কথা ভাবুন।প্রথম মানুষ — সুন্দর পোশাক। চকচকে জুতো। দামি ঘড়ি।দ্বিতীয় মানুষ — সাদাসিধে পোশাক। কিন্তু চোখে উষ্ণতা আছে। কথায় যত্ন আছে। কাজে সততা আছে।কার সাথে আপনি বেশি সময় কাটাতে চাইবেন?বিল্ডিংও তাই।সুন্দর facade আছে কিন্তু ভেতরে কোনো সম্পর্কের জায়গা নেই — সেটা Phenotype সুন্দর কিন্তু Genotype শূন্য।সাদামাটা দেখতে কিন্তু ভেতরে মানুষ মেলে, কথা হয়, জীবন আছে — সেটা Phenotype সাদা কিন্তু Genotype সমৃদ্ধ।পুরান ঢাকা দ্বিতীয় মানুষটার মতো। নতুন আবাসিক প্রকল্প প্রথম মানুষটার মতো।
কিন্তু আমরা সবসময় প্রথম মানুষটাকে বেছে নিচ্ছি।কারণ প্রথম মানুষটা Instagram-এ ভালো দেখায়।
ইতিহাসে একটা দারুণ উদাহরণ আছে।জাপানের Kyoto শহর।এটা ছিল জাপানের রাজধানী। হাজার বছর ধরে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা বোমা ফেলার তালিকায় Kyoto ছিল।কিন্তু আমেরিকার War Secretary Henry Stimson Kyoto বাদ দিয়ে দিলেন।কারণ তিনি সেখানে হানিমুন করেছিলেন। সেই শহরটার প্রাণ অনুভব করেছিলেন।একজন মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি একটা শহর বাঁচিয়ে দিল।Kyoto আজও আছে। তার পুরনো গলি আছে। তার Genotype অক্ষত।এবং প্রতি বছর কোটি মানুষ সেই শহরে যায় শুধু সেই প্রাণটা অনুভব করতে।Phenotype বোমায় মরে। Genotype বাঁচে।আমি একজন স্থপতি হিসেবে বিশ্বাস করি —পুরান ঢাকার গলি আমাদের সবচেয়ে বড় স্থাপত্যের পাঠ্যবই।সেখানে কোনো বিখ্যাত স্থপতির নাম নেই। কোনো পুরস্কার নেই। কোনো ছবি নেই।কিন্তু সেখানে হাজার বছরের মানুষের জ্ঞান আছে। মানুষ কীভাবে মিলতে চায়। মানুষ কীভাবে বাঁচতে চায়। মানুষ কীভাবে শহর গড়ে তোলে।সেই জ্ঞানটা না পড়ে Zaha Hadid পড়লে বাংলাদেশে Zaha Hadid হবে না।শুধু Zaha Hadid-এর নকল হবে।এবং নকল কখনো প্রাণ পায় না।
